ইতালিয়ান নিও রিয়ালিজম মূলত একটি শিল্প দর্শন। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চল্লিশ দশকের শেষে উন্মেষিত এই শিল্প ধারার পরিচালকদের মূল স্লোগান ছিল Take the camera, Out into the streets জীবন যেমন, তাকে সেইভাবে যথাযথ ছবির পর্দায় তুলে ধরলেন পরিচালকরা। সেই সঙ্গে যুক্ত হলো শিল্পীর সহজাত মানবিকতা, ন্যায় ও সত্যের মূল্যবোধ, জীবন নিষিক্ত ভালোবাসার সহজ সরল গভীর প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন বিন্যাসে ব্যক্তি চেতনার জাগ্রত প্রকাশ, মানুষের প্রাত্যহিক উত্থান-পতন, বিচ্ছিন্নতাবোধ, উৎকেন্দ্রিকতা, মানবিক মূল্যবোধের নব মূল্যায়ন, এই সবই ইতালিয় সিনেমার নয়াবাস্তবতার অবদান। ইতালিয় নিও রিয়ালিস্ট চলচ্চিত্রকারদের শিল্পকর্মের মধ্যদিয়ে ছবিতে সমাজ সচেতনতার ছাপ পড়লো।
যুদ্ধের বিধ্বংসী তাণ্ডবলীলায় ইতালির স্টুডিওগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিলো। অবশ্যম্ভাবী পরিণতি স্বরূপ শিল্পীরা স্টুডিও’র কৃত্তিম চত্বর ছেড়ে, সমস্ত রকম মেকি আধুনিকতার ফ্যাশন পরিত্যাগ করে যুদ্ধোত্তর ইতালির পথের ধুলোয় নেমে পড়লেন। উদ্দেশ্য একটাই দরিদ্র নিপীড়িত, লাঞ্চিত জনসাধারণের মুখের মিছিলে জীবনের বাস্তবরূপটি সন্ধান করা।
১৯৫২-তে ফরাসি পত্রিকা ‘ফিল্ম ইট ডকুমেন্টস’-এ নিও রিয়ালিজম এর মৌলিক দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে দশটি সূত্রের উল্লেখ করা হয়েছিল-
১. বক্তব্য
২. সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ,- কেন্দ্রিক সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন
৩. প্রামাণিকতা
৪. সূক্ষ-সংবেদনশীল রীতির আশ্রয়ে বাস্তবতার প্রকাশ
৫. স্বতঃস্ফুর্ত জনগণের কর্মকান্ড ক্যামেরায় বিধৃত করা
৬. অভিনেতা তথা চরিত্রের সত্যকে উপলব্ধি করা
৭. দৃশ্যগত প্রামাণিকতা ও স্টুডিও বর্জন
৮. কৃত্তিম আলোকসম্পাত ব্যতিরেকে ¯স্বাভাবিক আলোক উৎসের সত্যকে তুলে ধরা।
৯. ফটোগ্রাফির রিপোর্টধর্মী স্টাইল
১০. ক্যামেরার চূড়ান্ত স্বাভাবিক গতি ভঙ্গি অনুসরণ এবং দৃশ্যগ্রহণ পরবর্তী সিংক্রনিজম।
এবং আরোও কিছু বৈশিষ্ট লক্ষ্য করা যায়।
সাদা কালোয় নির্মিত।
চরিত্র দিয়ে গল্প বলানো।
গল্পের বিষয়বস্তু সাদামাটা।
দারিদ্র শ্রেণির অংশগ্রহণ।
চরিত্রগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরিক সুসম্পর্ক।
সততা।
জীবন সংগ্রামী (স্ট্রাগল)।
এই শিল্প আন্দোলনের প্রায় দুই দশক পরে ১৯৭৪ সালে ইতালিয় চিত্র সমালোচক নিও রিয়ালিজম সম্পর্কে মূল্যবান ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন- নয়া বাস্তবতা আন্দোলনটি মূলতঃ an ethics of aesthetics.
আসল কথা স্টুডিওর মেকী এবং কৃ্ত্রিম পরিবেশ ছেড়ে ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়।জীবন যেখানে যেমন তাকে সেখানেই তেমন করে তুলে ধর রুপালী পর্দায়।এরকম নতুন কিছু সৃষ্টির আহবান প্রবলভাবে যে কয়েকজন ইতালীয় পরিচালককে আকৃষ্ট করেছিল, যারা স্টুডিওর সাজানো বাগান ছেড়ে নেমে এসেছিলেন পথের ধুলায় তাদেরই একজন ভিত্তোরিও ডি সিকা (Vittorio De Sica)।আর ভিত্তোরিও ডি সিকার’ই এক অমর সৃষ্টি নিও-রিয়্যালিস্ট চলচ্চিত্র “দ্য বাইসাইকেল থিফ”(১৯৪৮)।এটি বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা একটি চলচ্চিত্র।বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন পত্রিকা, প্রতিষ্ঠান, ফিল্ম ইন্সটিটিউট কর্তৃক নির্বাচিত সর্বকালের সেরা ১০০ চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম “দ্য বাইসাইকেল থিফ”।
কাহিনী সংক্ষেপঃ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতালি।হতাশায় নিমজ্জিত আরো অনেকের মত এক বেকার এন্টনিও রিকি। একদিন সে হঠাৎ করে বিভিন্ন যায়গায় পোষ্টার লাগানোর একটি চাকরি পেয়ে যায়।কিন্তু এই কাজের জন্য প্রয়োজন একটি বাইসাইকেল।চাকরিদাতাদের কঠিন শর্ত ‘বাইসাইকেল যোগার করতে না পারলে চাকরি হবেনা’।যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে যেখানে হাজার হাজার লোক একটি চাকরির জন্য হন্য হয়ে ঘুরছে সেখানে এরকম একটি চাকরি পাওয়া বিশাল ব্যাপার।কাজেই চাকরি হাতছাড়া করা যাবেনা।”সাইকেল যোগার করা যাবে” এই শর্তে সে চাকরিটি নিয়ে নেয়।কিন্তু ঘিরে ধরে আরেক চিন্তা, কথা তো দিল কিন্তু সাইকেল পাবে কোথায়?এগিয়ে আসে রিকির স্ত্রী মারিয়া।বিয়েতে পাওয়া চাদরগুলো বিক্রি করে সাইকেল কেনা হয়।
কাজের প্রথম দিন সকালে রিকি তার ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।আর ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, ঐ দিনই সাইকেলটি চুরি যায়।এরপর ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে সাইকেলটি পাওয়া আর না পাওয়ার দোলাচলের মধ্যে।সাইকেল হারানোর বেদনায় রিকির স্ত্রী যখন ক্রন্দনরত তখন এগিয়ে আসে রিকির এক বন্ধু।সে রিকিকে আর তার ছেলেকে নিয়ে সাইকেল উদ্ধারের চেষ্টায় বেরিয়ে সাইকেলটির খোঁজ পায় কিন্তু প্রমানের অভাবে উদ্ধার করতে পারেনা।বন্ধু ফিরে গেলে রাস্তায় রাখা অন্য একটি সাইকেলের দিকে নজর পরে রিকির।ছেলেকে বাসে করে চলে যাওয়ার কথা বলে সাইকেলটির দিকে চুরি করার বাসনা নিয়ে এগিয়ে যায় রিকি।বাসটিতে উঠতে না পেরে ব্রুনো (রিকির ছেলে) যখন পেছনে ফিরে তাকায় তখন তার বাবাকে আবিষ্কার করে জনরোষের কবলে।সৎ কিন্তু দূ্র্ভাগ্যতাড়িত রিকির আসল অবস্থা বুঝতে পেরে সাইকেলের মালিক তাকে ছেড়ে দেয়।লজ্জিত ও অপমানিত রিকি এবং তার ছেলে ব্রুনো জনবহুল রাস্তায় হেঁটে বাড়ি ফিরছে এমন দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় “দ্য বাইসাইকেল থিফ”।
প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেনঃ
Lamberto Maggiorani – এন্টনিও রিকির চরিত্রে।
Enzo Staiola – ব্রুনো রিকি (রিকির ছেলের ) চরিত্রে।
Lianella Carell – মারিয়া রিকি (রিকির স্ত্রী) চরিত্রে।
পুরস্কারঃ
*১৯৪৯ সালে সেরা চিত্রনাট্যের জন্য Cesare Zavattini অস্কার মনোনয়ন লাভ করেন।
*১৯৪৯ সালে Golden Globe পুরস্কার সেরা বিদেশি চলচ্চিত্র বিভাগে।
*১৯৫০ সালে BAFTA Film Award লাভ।
এছাড়া আরো ১৪ টি পুরস্কার লাভ করে “দ্য বাইসাইকেল থিফ”।
পুরস্কার দিয়ে কখনো মাপা যাবেনা “দ্য বাইসাইকেল থিফ” চলচ্চিত্রের মাহাত্ম্য।একদিক দিয়ে যেমন নিওরিয়্যালিস্ট চলচ্চিত্র তেমনি অন্য দিক দিয়ে তৎকালীন ইতালির সমাজ ব্যবস্থায় যে টানাপোড়েন বিদ্যমান ছিল তার নিখুঁত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে দেড় ঘন্টা দৈ্র্ঘের এই চলচ্চিত্রে।সমাজ এবং মানুষের সম্পর্ক,সেখানে অর্থনীতির প্রভাব,পিতা-পুত্রের সম্পর্কের একেবারে গভীরের রুপ,একজন সৎ মানুষের হাহাকার, পরোক্ষভাবে যুদ্ধের কুফল সম্পর্কে নাড়া দেয়া কী নেই এই ছবিতে!


















