দিনের বেলায় আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই আমাদের চোখে সূর্যের যে আলো বা কিরণ ধরা পড়ে আসলে বাতাসে ভাসতে থাকা কিংবা বায়ুমণ্ডলে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বস্তুকণিকা থেকে ঠিকরে পড়া বিক্ষিপ্ত আলো।
দিনের আকাশের রঙ কেনও নীলে ভরপুর?
এ রহস্যের মূল বিষয় যিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর নাম ফেইম্যান। ২০ শতকের বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী, বিশ্ববিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির ছাত্র। ১৯৬৫তে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।
দিনের বেলায় আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই আমাদের চোখে সূর্যের যে আলো বা কিরণ ধরা পড়ে আসলে বাতাসে ভাসতে থাকা কিংবা বায়ুমণ্ডলে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বস্তুকণিকা থেকে ঠিকরে পড়া বিক্ষিপ্ত আলো। নীল রঙের আলো লাল রঙের আলো থেকে অনেক বেশি সহজে ছড়িয়ে পড়ে—আর আকাশের আলোর প্রায় সবটাই ঠিকরে ছড়িয়ে পড়া আলো বলেই আমাদের খালি চোখে আকাশকে নীল বলে মনে হয়। একে আমরা এক ধরনের বিভ্রান্ত দেখাও বলতে পারি। দড়িকে সাপ দেখার মতো আর কি! কেননা, বায়ুমণ্ডলের কারণে ভাসমান বস্তুকণা, ইলেকট্রন ও পরমাণুগুলো একে অন্যে ধাক্কাধাক্কি করার কারণে আলোর কিরণ বিক্ষিপ্ত হয়, ফলে যে রঙের আলো বেশি বিক্ষিপ্ত হয় সেটিই আমাদের চোখে ধরা পড়ে মাত্র। বাতাস না থাকলে দিনের বেলাতেও আকাশ রাতের আকাশের মতোই কালো দেখাতো; কেননা তখন আলো বিক্ষেপের কারণটি থাকতো না। বলা দরকার চাঁদে কোনো বাতাস নেই যা সূর্যের আলোকে ছড়িয়ে দিতে পারে। আর চাঁদের তো নিজের কোনো আলো নেই। জ্যোত্স্নার আলো ধার করা। তাই রাতের আকাশ কালো।
অবশ্য সূর্য যখন অস্ত যায় তখন সূর্যসহ গোটা পশ্চিম দিগন্তটা আবীর রঙে রাঙা হয়ে ওঠে আলো তখন বিক্ষিপ্ত হয় না বলেই। কেননা আমরা গোধূলি বেলায় প্রধানত সুন্দর রাঙা সূর্যটার দিকেই দৃষ্টি দেই। বিক্ষিপ্ত আলোর দিকে আমাদের নজর তেমন থাকে না। সূয্যিমামা যখন পাটে বসে সে তখন থাকে ঠিক দিগন্ত রেখার ওপরে। আর তাই সূর্যের আলোর কিরণকে আমাদের চোখে পৌঁছুতে হলে দিগন্ত থেকে মোটামুটি আনুভূমিক রেখায় সোজা আসতে হয়। আর তাই আলো সেক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বাতাস ভেদ করে আসতে হয়। ঐ সময় আমরা আগে যে কারণ বলেছি অন্যসব রং বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় কিন্তু লাল রংটা অবিক্ষিপ্ত থেকে যায় বলেই ঐ রংটাই আমরা দেখি।
এখন আমরা বিষয়টা বুঝতে বিজ্ঞানী ফেইম্যানের কথায় আসি। বায়ুমণ্ডলে অসংখ্য বস্তুকণিকা ভাসে যেগুলোর কথা মোটামুটি আমরা আগেই বলেছি তা থেকেই নানা রংয়ে আলো বিক্ষিপ্ত হয়। ফেইম্যান এই বস্তুকণিকাগুলো যখন ধাক্কাধাক্কি করে তখন কি হয় তা নির্ণয়ের পরীক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন। পদার্থ বিজ্ঞানীদের ভাষায় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বস্তুকণিকার এই ধাক্কাধাক্কিকে ইংরেজিতে বলেন এস-ম্যাট্রিক্স। এস বলতে তারা স্ক্যাটারিং বা বিক্ষিপ্তায়নকে বুঝিয়ে থাকেন। এই এস ম্যাট্রিক্স আসলে কিছু সংখ্যার সমষ্টি যার মাঝে তথ্য থাকে বস্তুকণিকাগুলোতে ধাক্কাধাক্কি লাগলে কি ঘটে। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি সহকারে একটি নির্দিষ্ট দিক বা কোণে কত সংখ্যক বস্তুকণিকা ছড়িয়ে পড়বে তার হিসেবও এতে পাওয়া যায়। তাই ঊনিশ শতকের বিজ্ঞানীরা একটা মোটামুটি ধরনের এস-ম্যাট্রিক্স কাজে লাগিয়ে প্রথম ধরতে পেরেছিলেন আকাশ কেন নীল আর গোধূলি কেন লাল। সকালের প্রথম সূর্যও তাই কি কারণে লাল তা বোধ হয় তোমাদের আর বলতে হবে না। আর এও বোধ হয় বলতে হবে না যে নীলাকাশ আমাদের এতো ভালো লাগে—এতো চিঠি লিখতে ইচ্ছা হয় আকাশের ঠিকানায় প্রকৃত অর্থে নীলও নেই, আকাশও নেই। তুমি যদ্দুর বিমানে বা রকেটে ওঠো ঠিক ওপরে ঝুলবে বটে নীল সামিয়ানা কিন্তু কখনো ধরা দেবে না অন্ত মেঘের মতো করেও। আকাশ আসলে শূন্য, মহাশূন্য।



















