সোপ অপেরা শব্দটি নতুন শোনাচ্ছে?
সোপ অর্থ সাবান, আর অপেরা অর্থ গীতিনাট্য। তবে ‘সোপ’ ও ‘অপেরা’ মিলে ‘সোপ অপেরা’ নামে যে-নতুন ‘বস্তু’র উদ্ভব ঘটেছে তা কিন্তু মোটেও ‘সাবান-নাট্য’ নয়। এটি হচ্ছে, এক বা একাধিক সমস্যার পরস্পর আন্তঃসম্পর্কে চলমান বিশদ ও বর্ণনাত্মক কাহিনীর ক্রমিক চিত্রায়ণ; যা এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে শেষ হয় যে, আগামী পর্ব আরও চিত্তাকর্ষক হবে। এর কাহিনী বিন্যাস এমন—আজ একটি সমস্যার তৈরি, তো কাল সেটির সমাধান।আবার পরশু যে-সমস্যা, পরের দিন সেটির সমাধান। এভাবে সমস্যা-সমাধান-সমস্যা ধারাবাহিকতায় গল্পটি চলতে থাকে। অবশ্য এতে একজন নির্মাতা (এ-ক্ষেত্রে শুধু যে-নির্মাতাই দায়ী এমনটি বলা যাবে না) নির্বিঘ্নেই বছরের পর বছর তার সোপ অপেরা চালিয়ে নিতে পারেন। এটি উপস্থাপনার আঙ্গিক থেকে সোপ অপেরার ব্যাখ্যা। অপেরার সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে আলবার্ট মরান বলেন ”সোপ অপেরা ঘটনার এমন এক ধারাবাহিক বর্ণনা যার পরতে পরতে রয়েছে ক্লাইমাক্স।”
টেলিভিশনে সোপ অপেরা এসেছে রেডিও থেকে। গত শতাব্দীর ২০ থেকে ৩০-এর দশকে রেডিও যন্ত্রটি একটি বিনোদন মাধ্যম হিসেবে গড়ে উঠে। প্রথমে রেডিও সেট বিক্রি করেই আয় করতো রেডিও কোম্পানিগুলো। পরে দেখা গেল ঘরে ঘরে রেডিও পৌঁছে যাবার ফলে সেট বিক্রি কমে আসছে আর অন্যদিকে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্যও এটা একটা ভালো মাধ্যম। রেডিওর নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রাইম টাইম বা সন্ধ্যার পরের অনুষ্ঠানগুলোই বেশী শোনে লোকজন, অন্য সময়গুলোর, বিশেষ করে দিনের বেলার অনুষ্ঠান তাই খুব একটা পাত্তা পায় না। তো দিনের বেলা অবসর গৃহিনীদের টার্গেট করে শুরু করা হলো ধারাবাহিক নাটক, যেগুলো আবার পত্রিকায় ছাপা হওয়া ধারাবাহিক উপন্যাসেরই অনুকরণ। দিনে দিনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো এসব ধারাবাহিক নাটক, আর যেহেতু গৃহিনীদের পছন্দের নাটক ছিলো এগুলো কাপড় কাচার সাবান আর পাউডার প্রস্তুতকারীরা এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে লাগলো এসব নাটকের আগে এবং মধ্য বিরতিতে। বরাবরের মতো পত্রিকাগুলো এসব নাটকের নাম দিলো ‘সোপ অপেরা’। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে টেলিভিশনেও জায়গা করে নেয় এসব সোপ অপেরা।

তবে উদ্দেশ্যের দিক থেকে একে ‘সাবান-নাট্য’ না বললেও, ‘সাবান-বেচা-নাট্য’ বললে অত্যুক্তি হবে না। আসলে সোপ অপেরার জন্মই দিয়েছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্র তৈরির উদ্দেশ্যে। ১৯ শতকের ৩০’র দশকে সাবান তথা প্রসাধনী তৈরির বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান যেমন-প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল, কোলগেট-পামওলিভ, লিভার ব্রাদার্স (হালের ইউনিলিভার) প্রভৃতি যে-সমস্ত রেডিও বা টিভি ধারাবাহিকগুলো প্রযোজনা করতো সেগুলোকেই বলা হতো ‘সোপ অপেরা’। ‘এর যাত্রা শুরু ১৯৩৭ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকায় বেতারে, প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল প্রযোজিত গাইডিং লাইট নামক সোপ অপেরা দিয়ে; যদিও টিভিতে এর সম্প্রচার শুরু ১৯৫২ সালে।
সোপ অপেরায় থাকে সেক্স , রোমান্স ,সাংসারিক কাহিনী , কলহ ,বিলাসিতা ,সন্দেহবাদিতা প্রভৃতির জমজমাট উপস্থাপন । সোপ অপেরা সাধারণত তার এই বহু কেন্দ্রিক উপাদান ও কাহিনীর জন্য জনপ্রিয়তা লাভ করে। যেখানে সিনেমার কাহিনী ছিল এককেন্দ্রিক সেখানে সোপ অপেরার কাহিনী বহুগামী ।

একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে সপ্তাহে একটা নাটক প্রচার হতো ‘এ সপ্তাহের নাটক’ হিসেবে। আরেকটি থাকতো ধারাবাহিক নাটক, সপ্তাহে একদিন প্রচার হতো তা। সংশপ্তক, এইসব দিনরাত্রি’র মতো নন্দিত ধারাবাহিকের কথা অনেকেই এখন স্মৃতিকাতর হয়ে উল্লেখ করেন। এখনকার মতো ঘরে ঘরেই টেলিভিশন ছিলো না তখন। নাটক কিংবা শুক্রবার বিকেলে সিনেমা দেখার জন্য ভীড় হতো বিত্তবানদের ঘরে। এখন স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যুগ, শহরে ঘরে ঘরে টেলিভিশন- গ্রামেও টেলিভিশনের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। ক্যাবল লাইনে দুনিয়ার চ্যানেল দেখা যায়, রিমোট কন্ট্রোল চেপে চ্যানেল বদলে বদলে সারা দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। এ চ্যানেলের অনুষ্ঠান পছন্দ হচ্ছে না তো অন্য চ্যানেলে সুইচ করো। এ আরেক মুক্তবাজার অর্থনীতি, আপনি ভোক্তা বা কনজিউমার, সামনে অসংখ্য পণ্য- যেটা পছন্দ তুলে নিন। নিয়মিত ভোক্তা হিসেবে আপনাকে ধরে রাখাই চ্যানেলগুলোর মূল প্রতিযোগিতা। যে চ্যানেল আপনাকে যতো বেশীণ ধরে রাখতে পারবে সে চ্যানেল বেশী বিজ্ঞাপন পাবে। আর আপনাকে ধরে রাখতে দিন দিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নাটকের সংখ্যা, প্রতিদিন নাটক- একক নাটক, ধারাবাহিক নাটক, সিরিয়াল, মেগা সিরিয়াল, ১০০ পর্ব, ২০০ পর্ব, ৩০০ পর্ব। কোথায় শুরু কোথায় শেষ তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। আমাদের দেশের চ্যানেলগুলোর প্রতিযোগিতা ভারত কেন্দ্রিক স্টার প্লাসসহ অন্যান্য চ্যানেলের সাথে। কারণ ওইসব চ্যানেলের মেগা সিরিয়াল, আসলে সোপ অপেরা।

জনপ্রিয়তার কারণ
১. এককেন্দ্রিক বনাম বহুগামী : সোপ অপেরার কাহিনী বহুগামী । মানব জীবনের বহুমুখী দিক নিয়ে সোপ অপেরার কাহিনী গড়ে উঠে । পক্ষান্তরে হলিউড বা সম সাময়িককালের কাহিনী ছিল এক কেন্দ্রিক যা সোপ অপেরার জনপ্রিয়তার কারণ ।
২. ১৯৩০-৫০ সালে দেখা যায় আমেরিকার অনেক প্রডিউসার সোপ অপেরা নির্মাণ করতে এগিয়ে আসেন । তাদের এই পদযাত্রা সোপ অপেরার জনপ্রিয়তার কারণ ।
৩. সোপ অপেরায় সাধানণত নারীদের প্রাধান্য দেখা যায় । গবেষণায় দেখা যায় শতকারা ৫৮ ভাগ ঘটনার উপস্থাপনই নারী কেন্দ্রিক ।
৪.সোপ অপেরার ঘটনার মারপ্যাচে পুরুষকে পরাজিত হিসেবে উপস্থাপিত করা হয় যার কারণে এটি নারীদের কাছে জনপ্রিয় ।অন্যদিকে যদিও এটি পুরুষদেরকে পরাজিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তবুও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষের কতৃত্ব এখানে সমানভাবে দেখানো হয়।
৫. সাংসারিক কর্মকান্ড ও সংসারের দৈনন্দিন ঝামেলা সোপের মূল উপজীব্য বিষয় হওযায় সাংসারিক সংকট উত্তরনের উপায় হিসেবে সোপ অপেরা জনপ্রিয়তা লাভ করে।

মূল্যায়ন -কি থাকে সোপ অপেরায়?
বিশ্বে সোপ অপেরা তৈরির শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ব্রাজিল । এখানে মোট বাজেটের চার ভাগের এক ভাগ সোপ অপেরা নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয় । সেক্স ও রোমান্টিসিজম ব্রাজিলের সোপ অপেরার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় । এই খাত থেকে আয়ের দিক থেকে শীর্ষে আছে ব্রাজিল । এর জন্য সেখানে একটি আলাদা নগরী গড়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কল্পকাহিনী ও রোমান্টিকতা সোপ অপেরার মূল উপাদান । গবেষনায় দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮ ভাগ লোক ভিন গ্রহের প্রাণী ও এলিয়েনে বিশ্বাস করে । এ কল্প কাহিনী ও এলিয়েন যুক্তরাষ্টের সোপ এপেরার একটি বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে ।
ভারতে টেলিভিশন বিনোদনের বড় অংশ জু্ড়ে রয়েছে সোপ অপেরা । ভারতের সোপ অপেরার মূল ধারা হল বিদ্যমান সমাজের কাঠামোর কোন পরিবর্তন না করে পৌরানিক কাহিনী অবলম্বনে সিরিয়াল তৈরি করা ।

আমেরিকা আর বৃটেনের সোপ অপেরার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, আমেরিকায় সোমবার থেকে শুক্রবার সপ্তাহের এ পাঁচ দিন আর বৃটেনে সাধারণত সপ্তাহে দুই দিন প্রচার হয় সোপ অপেরা। আবার ল্যাটিন আমেরিকায় এর নামই আলাদা ‘টেলিনভেলা’ আর কানাডার ফরাসী ভাষাভাষী অধ্যুষিত কুইবেক রাজ্যে এর নাম ‘টেলেরোমান’ (মানে সেই ‘টেলিনভেলা’ই)। আমেরিকা কিংবা বৃটেনের ‘সোপ অপেরা’ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা আগে থেকে ঠিক করা থাকেনা আর ল্যাটিন আমেরিকার ‘টেলিনভেলা’ কিংবা কানাডার ‘টেলিরোমান’ তিন মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েই শুরু হয়, অবশ্য জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সেগুলোর দৈর্ঘ্য বাড়ানো হয়ে থাকে। এ ধরনের ধারাবাহিক জনপ্রিয় হয়ে উঠার কারণে প্রাইম টাইমেও সোপ অপেরা বা সোপ অপেরা ধরনের সিরিয়াল প্রচার শুরু হয়।

একগাদা চরিত্রকে ঘিরে জমে উঠে সোপ অপেরা, এসব চরিত্রের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড নিয়েই এর গল্প তৈরি হয়। আর এসব চরিত্র সাধারণ নাগরিকের মতোই কেবল দর্শকদের চেয়ে বেশী সুদর্শন, লাবণ্যময়, মোহনীয় এবং ধনী। অন্যান্য ধারাবাহিকের সাথে সোপ অপেরার পার্থক্য হলো এগুলোর গল্প নির্দিষ্ট কয়েকটি চরিত্রকে ঘিরে নয়, মোটামুটি চরিত্রকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় (প্রচলিত অর্থে নায়ক নায়িকা চিহ্নিত করা যায় না)। বেশীরভাগ সোপ অপেরার গল্প জমে উঠে চরিত্রগুলোর রোমান্স, গোপন সম্পর্ক, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক এবং সত্যিকারের প্রেম নিয়ে। জটিল কূটকচাল এবং জটপাকানোর মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে গল্প। কখনো কখনো অসংগত সম্পর্ক রয়েছে এমন চরিত্রগুলোর বিভ্রান্তিকর গল্প নিয়ে, কখনো রহস্যময় অচেনা লোকের সাথে দেখা হওয়া এবং প্রেমে পড়া, বেপরোয়া প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যাওয়া, গোপনে প্রেমাষ্পদের পিছু নেওয়া এবং অসংগত যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া সোপ অপেরার গল্পকে চালিত করে। যা কে কার সাথে ঘুমাচ্ছে, কে কাকে দাগা দিলো, কে মা হতে চলেছে এবং কাদের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে ইত্যাদি আবিষ্কারের নেশায় দর্শককে পরবর্তী পর্ব দেখতে বাধ্য করে। যে কোন পর্ব থেকে সোপ অপেরা দেখা শুরু করা যেতে পারে, এদের একেকটি পর্ব শেষ হয় পরের পর্বে কি ঘটবে তা নিয়ে দর্শকের কৌতুহল জাগিয়ে, উৎকণ্ঠায় রেখে। দর্শকরা এমন একটি অবস্থানে থাকেন যে, তারা এসব গল্পের চরিত্রগুলোর চেয়ে বেশী জানেন এবং পরে কি ঘটতে পারে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা আড্ডার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেয়।

সোপ অপেরা এবং নারী দর্শক
সোপ অপেরা সাধারণত মহিলা দর্শকের টার্গেট করে তৈরি হয়। এবং প্রায়ই ধারণা করা হয়ে থাকে যে সাধারণ রুচি এবং সীমিত সামর্থ্যের (প্রধানত শ্রমিক শ্রেণীর) মহিলাদের উদ্দেশ্য করেই সোপ অপেরার গল্প সাজানো হয় (বিশেষ করে যারা কখনোই সোপ অপেরা দেখেননি তাদের ধারনা)। আমেরিকায় সোপ অপেরাকে সাংস্কৃতিক এবং নন্দনতাত্ত্বিক দিক থেকে নিচু মানের বলে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু কিছু কিছু নারীবাদী তাত্ত্বিক, টেলিভিশনের প্রাইম টাইম অনুষ্ঠানমালার বিপরীতে, সোপ অপেরা মহিলারী নন্দনতত্ব থেকে উদ্ভূত বলে মনে করেন। নাটকে যেমন শুরু, মধ্যবর্তী অবস্থা এবং শেষ থাকে সোপ অপেরায় তেমন শুরু কিংবা শেষ নেই, নেই কোন কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা। এগুলো কোন অর্থবোধক সমাপ্তিকে উদ্দেশ্য করে তৈরি হয় না। যে কোন পর্ব থেকে দেখা শুরু করতে পারেন একজন দর্শক। বিভিন্ন গল্প কয়েকটি পর্বে বুনে তোলা হয়, কোন একক ঘটনা বর্ণনার ধারা অনুসরণ করে না তা। সোপ অপেরার কাঠামো জটিল এবং কোন বিষয়ে চুড়ান্ত বলে কিছু নেই। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীকে একসাথে করা এবং মতানৈক্য এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কোন একক নায়ক থাকেনা এতে, অনেকগুলো চরিত্রের মধ্য থেকে দর্শক তার নিজের নায়ক পছন্দ করে নিতে পারেন। আর এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে দর্শকের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা তৈরির সুযোগ করে দেয় সোপ অপেরা।

তানিয়া মডেলেস্কি নামে এক লেখিকা তার ‘লাভিং উইদ আ ভেনজানস : মাস-প্রডিউজড ফ্যান্টাসিজ ফর ওম্যান’ (১৯৮২) নামে একটি বইয়ে সোপ অপেরার এই কাঠামোগত বাধ্যবাধকতাহীনতাকে বর্ণনার মহিলারী রীতি বলে উল্লেখ করেন (নারীবাদী এবং নারী অধিকার কর্মীরা ‘মহিলারী’ শব্দটি নিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন, ‘ফেমিনিন’ শব্দটির একটি যুতসই জেন্ডার সেনসেটিভ শব্দ না পেয়ে জীবনানন্দ দাশ থেকে ধার করে শব্দটি ব্যবহার করছি)।

স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং একটি পরিণতি রয়েছে এমন বর্ণনা রীতিই পুরুষালী অহং-য়ের পছন্দ। পুরুষালী বর্ণনা রীতি সংলাপের চেয়ে কর্মকাণ্ডকে (অ্যাকশন) প্রাধান্য দেয় এবং কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছার ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী স্তর এড়িয়ে চলে। এটা একরৈখিক এবং উদ্দেশ্যমুখী। সোপ অপেরায় অ্যাকশনের চেয়ে পরিণতির গুরুত্ব বেশী, এতে সম্পৃক্ত হয় নানা ধরনের জটিলতা এবং পরিণতিকে এড়িয়ে যায় তা। পুরুষালী বর্ণনা রীতিতে সংলাপ হয় কাহিনী তাড়িত এবং তা ব্যাখ্যা করে, স্পষ্ট এবং সরল করে তুলে। সোপ অপেরায় সংলাপ ঝাপসা হয়ে আসে, দীর্ঘায়িত হয়। এতে কোন একক নায়ক নেই, কোন নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অগ্রাধিকার নেই। বহুবিধ ঘটনাপঞ্জী এবং খুব কম নিশ্চয়তা এর বৈশিষ্ট্য। দর্শক নিজের বা পরিচিতদের সদৃশ্য চরিত্রগুলোর দৃষ্টিকোন থেকে ঘটনার ব্যাখ্যা তৈরি করে নিজেকে এসবের সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে করতে থাকে।

সোপ অপেরার প্রভাবে বালিকারা হয় ইচড়ে পাকা , মহিলারা হয় বালিকা ,বুড়িরা মরতে চায় না। এর প্রভাবে জীবন রঙিন হলেও অনেকক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয় । এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে আমাদের নওগাঁ এলাকার কোন নারী বাংলা চ্যানেল দেখে না । তাদের প্রিয় চ্যানেল ভারতীয় চ্যানেল ।আমাদের দেশের ১৫ ভাগ নারী স্টার জলসা নামক সোপ অপেরা দেখে যার কারণে আমাদের সংস্কতি আজ হুমকির মুখে । পরিসংখ্যানে দেখা গেছে আমাদের দেশের গৃহিণীরা দৈনিক ৮ ঘন্টা সোপ অপেরা দেখে সময় ব্যয় করে । এটি তাদের জীবন জাপনের উপর প্রভাব ফেলে ।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট আর চরিত্র নিয়ে এখনো ঠিক সোপ অপেরা অর্থে কোন কিছু এখনো শুরু হয়নি। ‘বাংলাদেশে এর শুরুটা সেই ১৯৯৯ সালে, বেসরকারি টিভি ‘চ্যানেলআই ’এ জোয়ার ভাটা নামে ডেইলি সোপের মাধ্যমে। আব্দুল্লাহ আল মামুন এর পরিচালনায় সোপটি ১০০ পর্ব শেষ করে। এরপর দীর্ঘ দিন আর ডেইলি সোপ প্রচার হয়নি। ২০০৭-০৮ সালে এটি নতুন করে চালু হতে থাকে। এ সময় মহানগর, গুলশান এভিনিউ, ডলস হাউস বেশ জনপ্রিয় হয়। তবে এর মানে এই নয় যে, এর আগে আমাদের দর্শক ডেইলি সোপের সঙ্গে পরিচিত ছিলো না। মূলত স্যাটেলাইটের বদৌলতে ভারতিয় চ্যানেল বিশেষ করে হিন্দি চ্যানেলগুলোতে ডেইলি সোপের দৌরাত্ম্য আমাদের দেশের নির্মাতাদের চিন্তায় ফেলে; তারই প্রতিক্রিয়া ছিলো দেশিয় ডেইলি সোপ। তবে ভারতিয় চ্যানেলগুলোর ডেইলি সোপের ধারে-কাছে যেতে পারেনি দেশিয় সোপগুলো। তবে ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে তা বেশ দাপটের সাথে দাবড়ে বেড়াচ্ছে আর তার সাথে বাজার ধরার প্রতিযোগিতায় আমাদের চ্যানেলগুলো যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে সে ভরসা নেই। বরং সোপ অপেরা অনুসারী মেগা সিরিয়াল তো সব চ্যানেলেই রাজত্ব বিস্তার করছে। অচিরেই সেগুলো সোপ অপেরার চরিত্র ধারন করবে বলেই তো মনে হচ্ছে।


















