সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠার পর প্রথম কাজ দাঁত মাজা।তাই বলা যায় সকালবেলার পরম বন্ধু টুথব্রাশ। যে জিনিসটি দিয়ে আমাদের দিনের যাত্রা শুরু হয়, সেই জিনিসটারও যে ইতিহাস থাকতে পারে তা আমাদের মাথায় সচরাচর আসেই না। তাই এখন গল্পের মতন বলা হবে টুথব্রাশের আদিকথা।
আজকে আমরা যাকে ‘টুথব্রাশ’ নামে চিনি শুরুতে তা ছিল আদতে একটা নিতান্ত কাঠি মাত্র। মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ সালের দিকে সর্বপ্রথম দাতের মাজন হিসেবে বিশেষ কোনো গাছের কাঠি ব্যবহার করা হতো। রোমান এবং গ্রীকরা মূলত ব্যবিলনীয়দের কাছ থেকেই দাত পরিষ্কারের কাজে কাঠির ব্যবহার শেখে। ধারণা করা হয়, তৎকালীন সময়ে বর্তমানের নিম গোত্রিয় যে সব গাছ ছিল, যে গাছগুলোর কাছে মশা-মাছি আসলে মারা যেতো সেই গাছের ছোটো ডালকেই দাতের মাজন হিসেবে ব্যবহার করা হতো। স্থান-কাল ভেদে এই গাছের পরিবর্তন হয়েছে মাত্রা।
তবে আমরা যে আধুনিক টুথব্রাশ দেখতে পাই তা শুরু হয়েছে মূলত খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ সালে চীন দেশে। চীনের ‘চিন’ রাজবংশের সমাধিস্থল আবিষ্কারের সময় এই দন্তমাজনও আবিষ্কৃত হয়েছিল। জানা যায়, একটি নির্দিষ্ট পশুর শরীরের পশম দিয়ে তৈরি করা হতো ওই দন্তমাজন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বেশিদিন আগের কথা নয় রাজা নেপোলিয়ন যে দন্তমাজন ব্যবহার করতেন তা তৈরি করা হয়েছিল ঘোড়ার লেজের পশম দিয়ে। আফ্রিকায় বহু আগে থেকেই দাতের যত্নে কাঠির ব্যবহার প্রচলিত ছিল। সেই কাঠিই মধ্যপ্রাচ্যে অথবা আরব বিশ্বে মেসওয়াক হিসেবে বিবেচিত হয়। এখনও আরববিশ্বসহ মুসলিম দেশগুলোতে মেসওয়াক ব্যবহার করা হয়।
১২ শতকের দিকে চিনে এক ধরনের টুথব্রাশ ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ব্রাশগুলো আবার খুবই মজার। ঘোড়ার লেজের পশম হাড়র সঙ্গে গেঁথে এই ব্রাশগুলো বানানো হতো! এগুলোকে বলে ব্রিসল টুথব্রাশ। আসলে, টুথব্রাশের সামনের দিকে যে পশমের
মতো জিনিসগুলি লাগানো থাকে, সেগুলোকে বলে ব্রিসল। আর এই ব্রাশেই প্রথম ব্রিসল ব্যবহার করা হয়েছিল বলেই এই টুথব্রাশের নাম ব্রিসল টুথব্রাশ। এই ব্রিসল টুথব্রাশই কিন্তু আজকের টুথব্রাশের জনক।
ইউরোপে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে টুথব্রাশ তৈরি শুরু হয় মূলত ১৭৮০ সালে। দাঙ্গা লাগানোর অভিযোগে উইলিয়াম অ্যাডিস নামের এক ব্রিটিশকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকাকালীন সময়েই অ্যাডিস প্রথম অনুধাবন করেন দাত পরিষ্কার করার ব্যাপারটি। প্রথমে তিনি কাঠিতে সুতো পেচিয়ে লবন দিয়ে দাত পরিষ্কার করার কাজটি করতেন। পরে একদিন খাবারের থালায় ছোটো একটি হাড় পান তিনি এবং সেটাকে সংরক্ষন করেন অ্যাডিস।
এরপর হাড়ের গায়ে কয়েকটা ছিদ্র করেন এবং কারারক্ষীদের কাছ থেকে ছোটো অথচ শক্তিশালী পশম সংগ্রহ করেন তিনি। সেই শক্ত পশমগুলোকে তিনি হাড়ের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করান এবং আঠা দিয়ে ছিদ্রটি বন্ধ করে দেন। অ্যাডিস কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর বাণিজ্যিকভাবে তার আবিষ্কৃত দন্তমাজন বিক্রি করতে শুরু করেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ধনী হয়ে যান। তৎকালীন সময়ে উইলিয়ামের বানানো দন্তমাজন গোটা যুক্তরাজ্যে বছরে ৭০ মিলিয়ন দন্তমাজন বিক্রি হতো।
১৮৫৭ সালের দিকে এইচ.এন.ওয়াডসওয়ার্থ নামের এক মার্কিনী নিজের নামে টুথব্রাশের পেটেন্ট করিয়ে নেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাণিজ্যিকভাবে দন্তমাজন উৎপাদন শুরু হয় ১৮৮৫ সাল থেকে। তখন দন্তমাজনে ব্যবহার করা হতো সাইবেরিয়ার শূকরের চুল। যদিও ব্যকটেরিয়ার কারণে পশুর পশম দিয়ে বেশিদিন কাজ চালানো যায়নি। এরপর অনেকেই হাড়ের স্থানে কাঠ কিংবা হাতির দাত ব্যবহার করতে শুরু করেন। উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকরা জানতেনই না যে নিয়মিত দাত পরিষ্কার করতে হয়। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন যোদ্ধাদের জন্য দাত পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক করা হয়।
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর এই উৎকর্ষতার সময়ে দন্তমাজন এখন শুধু হাড়-কাঠ-প্লাস্টিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন দন্তমাজনের জন্য বৈদ্যুতিক মাজনও ব্যবহার করা হচ্ছে অনেক স্থানে। যেহেতু দাত পরিষ্কারের বিষয়টির সঙ্গে এখন রোগ-জীবানুর সম্পর্ক আছে তাই প্রত্যেককেই দাত পরিষ্কার করার ব্যাপারে সচেতন হতে হচ্ছে।


















