লেখার আবিষ্কার বা ‘আওয়াজ কিভাবে অক্ষরে’ পরিণত হলো—এ এক বিরাট রহস্য; কিন্তু সে বিষয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। একটু কম রহস্যময় একটি বিষয় নিয়ে ভাবা যাক এবার। সেটি হল মানুষের যোগাযোগের খুব শক্তিশালী এক হাতিয়ার: পেন্সিল।
পেন্সিল বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কীর্তিতে, শিল্পীকে ইন্ধন যুগিয়েছে- স্কেচবুক, মেরিলিন মনরো’র দরদী অপ্রকাশিত কবিতা, লিসা কোডনের বিস্ময়কর পোর্ট্রেট বা ডেভিড ব্রায়ানের হিউম্যান কনডিশন ডায়াগ্রাম ইত্যাদি। এগুলো দুইশো বছরের সামান্য কয়েকটি উদাহরণ।
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সেনাবাহিনীতে কর্মরত একজন বিজ্ঞানী নিকোলাস-জ্যাক কোন্টে ১৭৯৫ সালে আধুনিক পেন্সিল আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কারের জন্য জাদুকরি জিনিসটি হল কার্বনের একটি রূপ যেটিকে ‘গ্রাফাইট’ বলা হয়। এটি প্রথম পনেরো শতকের শুরুতে ইউরোপের বাভারিয়ায় আবিষ্কার হয়। যদিও অ্যাজটেকরা কয়েকশো বছর আগেই বিভিন্ন জিনিস দাগ দিয়া রাখতে গ্রাফাইট ব্যবহার করতো। প্রাথমিকভাবে এটিকে সীসার একটি রূপ ভাবা হত এবং ‘প্লামবাগ’ বা কালো সীসা বলা হত। ১৭৮৯ সালে এটিকে গ্রাফাইট নাম দেয়া হয়। গ্রিক শব্দ গ্রাফেইন (Graphein) থেকে এটি এসেছে, যার অর্থ হল ‘লেখা’। পেন্সিল একটি প্রাচীন শব্দ, যেটি ল্যাটিন শব্দ পেন্সিলাস (Pencillus) থেকে এসেছে। যার অর্থ হল ‘ছোট লেজ’। মধ্যযুগে লেখার জন্য ব্যবহৃত কালির ব্রাশকে ‘ছোট লেজ’ বলা হত।
কিন্তু অন্য অনেক উদ্ভাবনের মতই পেন্সিলের ইতিহাসেরও একটি কালো অধ্যায় রয়েছে: ১৫৬৪ সালে ব্রিটেনের কেসউইকের কাছাকাছি বোরোদেতর লেক ডিস্ট্রিক্টে বিশুদ্ধ গ্রাফাইট পাওয়া যায়; পরে সেখানে গ্রাফাইট চোরাচালান ভিত্তিক এক কালোবাজারি অর্থনীতি তৈরি হয়। উনিশ শতকে এই গ্রাফাইট ব্যবসার জন্য কেসউইকে পেন্সিল উৎপাদনের একটি বড় শিল্প বিকশিত হয়।
পেন্সিলের প্রথম কারখানাটি ১৮৩২ সালে খোলা হয়। কাম্বারল্যান্ড পেনসিল কোম্পানি কিছুদিন আগেই তাদের ১৭৫ তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে। যদিও স্থানীয় খনি দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ হয়ে গেছে এবং এখন গ্রাফাইট শ্রীলংকা ও আরও অনেক দূর-দূরান্ত থেকে আনা হয়। কাম্বারল্যান্ড পেন্সিলের মান ছিলো সবচেয়ে ভাল, কারণ তাদের পেন্সিল দিয়ে লেখা বা আঁকার সময় গুঁড়ো পড়ে না, কাগজে ভাল দাগও কাটে।
কোন্ট পেন্সিলের মূল প্রক্রিয়া হচ্ছে, নরম গ্রাফাইটকে কাঠের আকৃতির মধ্যে জড়ানোর আগে ১৯০০ ডিগ্রী ফারেনহাইটের একটি চুল্লীতে পানি, কাদা এবং গ্রাফাইট মেশানো। কাঠের আকৃতি চারকোনা, বহুভুজ বা বৃত্তাকারও হতে পারে। এটি পেন্সিলটির ব্যবহারের উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে। কাঠের কারিগররা বৃত্তাকার পেন্সিল চান না, কারণ এটা তাদের কাজের বেঞ্চ থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়। গরম মিশ্রণে কাদামাটি এবং গ্রাফাইটের আপেক্ষিক পরিমাণ ঠিক করে তৈরিকৃত পেন্সিলের ‘সীসার’ কঠোরতা বা কোমলতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
বাণিজ্যিক পেন্সিল নির্মাতারা সাধারণত পেন্সিলের ২০ গ্রেড বাজারজাত করে। নরমের জন্য ৯বি থেকে শুরু হয়ে শক্তের জন্য ৯এইচ পর্যন্ত। এইচ ও বি এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মান হল এইচবি। ‘এইচ’ মানে শক্ত আর ‘বি’ মানে কালো। বি এর সংখ্যা বেশী মানে কাগজে গ্রাফাইট বেশী পড়বে। ‘এফ’ বা ফাইন পয়েন্ট এর পেন্সিলও আছে যা আঁকার চেয়ে লেখার জন্য বেশি ভাল। এই পেন্সিলটি শক্ত।
গ্রাফাইটের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, এটি খাঁটি কার্বনে তৈরি পৃথিবীর সবচে নরম কঠিন পদার্থ। এটি অন্যতম সেরা লুব্রিকেন্টও। কারণ ছয়টি কার্বন পরমাণু যা একটি রিং গঠন করে যুক্ত আছে সেটা নিকটবর্তী রিং এর উপর সহজে পিছলিয়ে যেতে পারে।
অথচ, স্রেফ পারমাণবিক গঠন পরিবর্তনের কারণে আরেকটি বিশুদ্ধ কার্বনে তৈরি পদার্থ হীরা পৃথিবীর সবচে শক্ত পদার্থগুলির একটি!
একটা মজার প্রশ্ন হচ্ছে, শেষ হওয়ার আগে সাধারণ একটি HB পেন্সিল দিয়ে কতটা লম্বা সোজা লাইন আঁকা যাবে? নরম একটি ২বি পেন্সিল দিয়ে দাগ দিলে কাগজ থেকে উপরে প্রায় ২০ ন্যানোমিটার পুরু গ্রাফাইটের স্তর হবে। (আর একটি কার্বন পরমাণুতে ০.১৪ ন্যানোমিটারের ব্যাস থাকে, ফলে দাগটি মাত্র ১৪৩ পরমাণু মোটা হয়।) এই পেন্সিলটির লিড প্রায় ১ মিমি ব্যাসার্ধের। পেন্সিলটির দৈর্ঘ্য ১৫ সেমি হলে গ্রাফাইটের ভলিউম একটি সরল রেখার উপর ১৫০ x π ঘন মিমি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। তাই আমরা যদি ২০ ন্যানোমিটার পুরু এবং ২ মিমি চওড়া (লিডের ব্যাসের সমান) একটি রেখা আঁকি তবে (১৫০ x π) / (২০ x ২) = ১১.৭৮ কিলোমিটার লম্বা দাগ হবে সেটি।
একটি বিশেষ পরামর্শ –
প্লেনে লেখালেখির জন্য পেন্সিল নেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ; কারণ, প্লেনের অল্প বায়ুচাপের ভিতর কলমের কালি চুইয়ে পড়ে; আপনি লিখতেও পারবেন না, জামাকাপড়ও নষ্ট করে ফেলবেন হয়তো। তবে, পেন্সিলের ডগাটি ভেঙে গেলে কিন্তু আপনি সেটি আবার চোখা করার কোন সুযোগ পাবেন না। কারণ, প্লেনে আপনি কোন ধরনের ধারালো জিনিস নিতে পারবেন না। ভালো হয় যদি অন্তত দুটি পেন্সিল নিয়ে যান।


















