বইনরে; বড্ড মারছে আমার আজাদরে।আমি কইলাম বাবা কারো নাম বল নাই তো?সে কইল,’না মা,কই নাই।কিন্তু মা যদি আরো মারে?ভয় লাগে যদি কইয়া ফেলি?আমি কইলাম,’বাবা,যখন মারবো,তুমি শক্ত হইয়া সহ্য কইরো।’
উপরের বক্তব্যটুকু আজাদের মায়ের।স্বার্থপর যে বর্তমান দুনিয়ায় আমরা বাস করি সেখানে এরকম কথা পড়লে গল্পই মনে হয় বটে!একটা সময় ছিল ডায়রী লিখতাম।সারাদিন কি করলাম তার ছোটখাটো বর্ণনা। পরে মনে হল কি হবে এগুলো লেখে..অভ্যাসটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।আজ নতুন করে উপলব্ধি করতে পারলাম ডায়রী লেখার গুরত্ব।একটা ডায়রী..রোজকার কিছু টুকরো টুকরো ঘটনা… এবং একটি ইতিহাসের সাক্ষী।বলছি আজাদের মায়ের মতো আরেকজন মায়ের কথা।শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।
ছোটবেলা থেকে বুকশেলফ এ ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটা অনেকবার দেখলেও কোন এক কারণে পড়া হয়ে ওঠেনি।বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র বইটি পড়ার সুযোগ করে দিল।জানা ছিল বইটি অতুলনীয়। আগ্রহ নিয়ে ক্লাসের ফাঁকেই শুরু আরম্ভ করেছিলাম পড়া।২০১৯ থেকে ১৯৭১এ কখন পৌছেছিলাম জানিনা..তবে বইটি শেষ করার পর রেশ কাটেনি।মনে হচ্ছে ৭১ এর ১৭ ডিসেম্বর এই আটকে আছি।
আমার ধারণা দেশপ্রেম শব্দটার সাথে আমাদের বেশিরভাগেরই পরিচিতি ঘটে ভালভাবে দেশপ্রেম রচনা মুখস্থ করতে গিয়ে।দেশপ্রেমিক বলতে আমরা ততটুকুই বুঝি যতটুক বাংলা বই এর সংজ্ঞায় থাকে।সত্যিকারের দেশপ্রেমিক.. দেশপ্রেম লালন করতেন যারা কিংবা এখনো করেন তাদের ক’জন কে আমরা ভালভাবে জানি?
আমার কল্পনাশক্তি ভাল নাকি বইটির আকর্ষনক্ষমতা তীব্র আমার জানা নেই।এতটুকু জানি শুধু ২৭০ পৃষ্ঠার এই বইটির মাধ্যমে সেকেন্ড ইয়ারের একটা ক্লাসরুমে বসে আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখে এসেছি!
একজন মায়ের আত্মত্যাগ, একটি পরিবারের আত্মত্যাগ.. একইভাবে বাঙালিদের আত্মত্যাগ.. এবং সকলের সহযোগিতা.. বয়স থেকে শুরু করে সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক হতে পারা এবং লড়াই করা.. স্বজন হারানো এবং স্বাধীনতা অর্জন! মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমরা কম বেশি সবাই জানি।কিন্তু আমরা যারা যুদ্ধ দেখিনি.. আমরা কতটুকু উপলব্ধি করতে পারি সে সময়ের অবস্থার কথা?এত মানুষের ত্যাগ এর কথা?আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হন লাইনটা মুখস্থ করতে পেরেছি অনেক আগেই..ব্যপারটা কে কতটুক উপলব্ধি করতে পারি আমরা.. আমার জানা নেই।
প্রতিটা পাতায় যেন দেখতে পাচ্ছিলাম ইতিহাসকে নতুন করে..এক একবার মনে হচ্ছিলো গেরিলা বাহিনীর আক্রমণ দেখছি চোখের সামনে!আর সেই ধরে নিয়ে যাওয়ার পর অত্যাচারের বর্ণনা?ও ব্যাপারে লিখতে গেলেও হাত কাঁপছে! একজন মায়ের ডায়রীর পাতায় এভাবেও পুরো দেশের অবস্থা ফুটে উঠতে পারে পুরোটা না পড়লে বোঝা সম্ভব নয়।
রুমীর এই আত্মত্যাগ এই দেশপ্রেম..এমন হাজারো রুমী ছিলেন সে সময়ে বাংলার বুকে.. তাদের ব্যপারে আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কতটুকু জানে?তাদের জানতে দিন। দেশপ্রেম কি তা শুধু রচনা মুখস্থ করে নয়..উপলব্ধিও করতে দিন।বাচ্চাদের শুধুমাত্র রাজা রাজকুমার কিংবা সিন্ড্রেলার গল্পের পাশাপাশি দেশের ইতিহাস নিয়েও গল্প করুন।তাদের জানতে দিন। তবে খেয়াল রাখতে হবে বিকৃত ইতিহাস যেন তারা না জানে।
ছোটবেলায় আবেগময় কোন উপন্যাস বা গল্প পড়লে চোখ ছলছল করতো।এই বইটা পড়তে গিয়ে কতবার চোখ ভিজে উঠেছে বলতে পারবোনা। মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছিলাম।খানিক পরেই মনে পরছিলো.. এতো কোন গল্প নয়!
ছবিটা গুগলে দেখার পর কেমন যেন ভেতরে একটা ধাক্কা লেগেছিল।কি জীবন্ত ছবিটা!শহীদ জননীর প্রতি এবং তার পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা রইলো।শ্রদ্ধা রইলো সে সময়ের প্রতিটা মানুষের প্রতি যাদের জন্য আজ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বসে অহংকার করতে পারি..জোর গলায় বলতে পারি আমরা বাঙালি।আমরা বাংলাদেশী!
একাত্তরের দিনগুলি পড়ুন।অন্যকে পড়ার পরামর্শ দিন।প্রয়োজন হলে অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিন।














