বুর্জ খলিফার ১৬৯ তলায় যেতে হলে সাথে করে অক্সিজেন নিয়ে যেতে হয়। বুর্জ খলিফায় ১৬৯ তলার ওপর থেকে মাঝামাঝি স্থানে দিনে-রাতে চবি্বশ ঘণ্টায় জোনাকির মতো একবার সাদা আলো জ্বলছে আবার আলো নিভছে; যা বহুদূর থেকে দেখা যায়।

বুর্জ খলিফার অধিবাসীরা অন্যদের চেয়ে আগে সূর্য দেখেন
বুর্জ খলিফায় বসবাসরত অধিবাসীরা দিনের শুরুতে সমতলের অধিবাসীদের চেয়ে আগে সূর্য দেখেন এবং দিনের শেষেও সমতলের অধিবাসীদের চেয়ে তারা বেশি সময় সূর্য দেখতে পান। এ জন্য তাদের কাছে দিনের পরিধি অনেক বেশি। ফলে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের মধ্যবর্তী সময়ের বিস্তার অনেক বেশি।

বুর্জ খলিফার ওজন
বিশ্বের সর্বোচ্চ এই ভবনটির মোট ওজন ৫ লাখ টন। ভবনটি নির্মাণে লেগেছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কিউবিক মিটার কংক্রিট, ৩৯ হাজার মিটার স্টিল, ১ লাখ ৩ হাজার বর্গমিটার কাচ এবং ১ লাখ ৫৫ হাজার বর্গমিটার স্টেইনলেস স্টিল।

প্রতি বর্গ মিটার জায়গার দাম
বিলাস বহুল এই ভবনের একেকটি কামরা কেনার জন্য বর্গ মিটার প্রতি ক্রেতাদের গুনতে হয়েছে গড়ে ৩৭,৫০০ মার্কিন ডলার। এত উচ্চ মূল্য থাকা স্বত্বেও দুই বছরের মধ্যেই ৯০০ কামরার প্রায় সবকটিই বিক্রি হয়ে গেছে। বুর্জ খলিফায় প্রতি বর্গফুট জায়গার মাসিক ভাড়া (অফিস-আদালতের জন্য) চার হাজার ডলার বা দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা।
ভবনটির চারপাশে রয়েছে ৭.৪ একরের অপরুপ সুন্দর উদ্যান আর ৩০ একর আয়তনের কৃত্রিম হ্রদ। বুর্জ খলিফার বাসিন্দাদের জন্য প্রতিদিন ৯,৪৬,০০ লিটার পানির প্রয়োজন পড়ে যা ১০০ কিমি. পরিমান অভ্যন্তরীণ পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। শীততাপ নিয়ন্ত্রনের জন্য ৩৪ কিমি. এবং জরুরি অগ্নি নিয়ন্ত্রনের জন্য রয়েছে আরও ২১৩ কিমি. পরিমান বিশেষ পাইপ লাইন ব্যবস্থা। বিশাল এই ইমারতটি একসঙ্গে ২৫ হাজার লোকের ভার সইতে পারবে।

আমেরিকানদের অগ্রাধিকার
বুর্জ খলিফায় আমেরিকানদের বসবাসের অগ্রাধিকার বিশেষভাবে লক্ষনীয়। তাদের জন্য এই ভবনের ৯ থেকে ১৬ তলা পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আত্মহত্যায় রেকর্ডের অধিকারী
কত ধরনের রেকর্ডই তো রয়েছে এই পৃথিবীতে। তেমনি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবনের রেকর্ডের পাশাপাশি ‘বুর্জ খলিফা’র রয়েছে আত্মহত্যায়ও রেকর্ড। ভবনটি চালু হওয়ার ১৮ মাস পর ১০ মে ২০১১ তারিখ জনৈক ব্যক্তি এই অট্টালিকার ১৪৬ তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন। লাফিয়ে পড়ার পর লোকটি ৩৮ তলায় এসে পড়ে নিহত হন। এটিই হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু স্থান থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করার রেকর্ড।
মালিকানা
বুর্জ খলিফার মালিকানা দুবাইয়ের একটি আধা সরকারি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি এমার প্রপার্টিজ। এর স্থপতি হলেন যুক্তরাষ্ট্রের অড্রিয়ান স্মিথ। এর নকশা প্রণয়নকারী হলো যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্কিডমোর ওয়িংস অ্যান্ড মেরিল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্যামসাং, বেলজিয়ামের বিইএসআই এক্স গ্রুপ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আর্বটেক। প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ শ্রম ঘণ্টা লেগেছে ভবনটি নির্মাণে। এ প্রকল্পে জড়িত ছিলেন ৩৮০ জন দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ।

বাইরের জানালা পরিষ্কার
বুর্জ খলিফায় রয়েছে ২৪,৩৪৮টি জানালা। এসব জানালা কিভাবে পরিষ্কার করা হবে তার পরিকল্পনা নির্মাণ করার সময়ই করা হয়। জানালা পরিষ্কার করার জন্য অনুভূমিকভাবে (হরিজেন্টালি) ৩টি ট্রাক রয়েছে। এই ট্রাকগুলো ৪০, ৭৩ ও ১০৯ তলায় অবস্থিত। পরিচ্ছন্নকর্মীরা উপরের ট্রাক থেকে পরিষ্কার করতে করতে নিচের ট্রাকে এসে থামে। বুর্জ খলিফার বাইরের সম্পূর্ণ অংশ এভাবে পরিষ্কার করতে ৩৬ জন শ্রমিকের ৩ থেকে ৪ মাস সময় লেগে যায়।

যাদের শ্রমে নির্মিত হয়েছিল বিশাল এই ভবনটি
টাওয়ারটি নির্মাণে শ্রমিক আনা হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়া থেকে। অভিযোগ আছে, সেসব শ্রমিকদের পারিশ্রমিক ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। মাঝে একবার শ্রমিকদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল দেশটির সরকারকে। একজন দক্ষ কাঠমিস্ত্রি রোজ ৪ দশমিক ৩৪ পাউন্ড করে পেতেন। আর সাধারণ শ্রমিকদের দেওয়া হতো দৈনিক ২ দশমিক ৮৪ পাউন্ড করে। এই যতসামান্য পারিশ্রমিকও প্রায়ই আটকে দেওয়া হতো। এসবের প্রতিবাদ করতে গিয়েই আড়াই হাজার শ্রমিক ২০০৬ সালের ২১ মার্চ কর্মবিরতি ঘোষণা এবং বিক্ষোভ করেন।

বুর্জ খলিফার রেকর্ড
- সর্বোচ্চ ভবন: ২ হাজার ৭১৭ ফুট (৮২৮ মিটার)
- বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তলাবিশিষ্ট ভবন: ১৬০ তলা
- দীর্ঘতম এলিভেটর যাত্রা
- পৃথিবীর দ্রুততম এলিভেটর: গতি ঘণ্টায় ৬৪ কিলোমিটার
- উচ্চতম আবাসনব্যবস্থা: ১০৮ তলা পর্যন্ত
- সর্বোচ্চ স্থানে মসজিদ: ১৫৮ তলা
- উচ্চতম স্থানে সুইমিংপুল: ৭৬ তলা
- সর্বোচ্চ স্থানে পর্যবেক্ষণ ডেক: ৪৪২ মিটার উঁচুতে
ভূমিকম্প প্রতিরোধী
খারাপ আবহাওয়ায় যাতে ভেঙে না পড়ে বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য ভবনটি ওয়াই আকৃতিতে তৈরি করা হয়েছে। এর ওজন সমভাবে বহন নিশ্চিত করতে তিনটি উইং রয়েছে।
ফ্লোর বিন্যাস:
ভবনের ১৯ থেকে ৩৭ তলা এবং ৭৭ থেকে ১০৮ তলায় থাকার ব্যবস্থা আছে। প্রায় ৯০০ অ্যাপার্টমেন্ট আছে ভবনে। ১৫৮তলায় আছে একটি মসজিদ; ৪৩তম এবং ৭৬তম তলায় আছে দুটি সুইমিং পুল। আরো আছে ১৬০ কক্ষবিশিষ্ট একটি হোটেল। ১২৪তম তলায় দর্শকদের জন্য প্রকৃতি দর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
২০১৬ সালের মধ্যেই ‘বুর্জ খলিফার’ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটটি নিজের করে নিবে সৌদি আরবের জেদ্দা শহরে নতুন নির্মাণাধীন একটি ভবন। সৌদি যুবরাজ আল ওয়ালিদ বিন তালাল জেদ্দা শহরে লাল সাগরের পারে এই ভবনটি তৈরি করছেন। এই ভবনটির উচ্চতা হবে ১০০০ মিটার। যুবরাজের এই স্বপ্নের বাড়িটিতে থাকবে হোটেল, বিলাসবহুল বাসস্থান, সবরকমের সুযোগ, সুবিধা সম্পন্ন অফিস। বিন লাদেন গোষ্ঠীর সঙ্গে ৪.৬ বিলিয়ন রিয়াল বা ৭৫ কোটি ৬০ লক্ষ পাউন্ডের চুক্তি করা হয়েছে এই ভবনটি নির্মাণের জন্য। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে এই চুক্তি হয় এবং পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে এই ভবনের নির্মাণ শেষ হবে।


















