“হৃদয় নামেতে এক বিশাল অরণ্য আছে
দিশে দিশে নাহিক কিনারা,
তারি মাঝে হনু পথহারা।”
কবিগুরুর এই সুরেই সুর মিলিয়ে বলতে হয় সত্যিই এই বিশাল অরণ্যে আমরা প্রায়ই হারিয়ে যাই। এই অরণ্যে আছে সুরের মেলা, রঙ্গের খেলা। সুর আর রঙের দোলাচলে ভাসে আমাদের জীবন। কখনও ছন্দপতন হয়। কখনও রঙের খেলা থেমে যায়। চারদিকে ধূসর আর ধু ধু প্রান্তর। আবার হৃদয়বীণায় সুর বেজে উঠে, মনের আকাশে রঙ্গীন ঘুড়ি উড়ে। চারিদিকে সুর জেগে উঠে-
“তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রানে
সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে।”
চারিদিকে চেয়ে দেখি-
“আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরির খেলা
নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা।”
সুরের আগুন আর সাদা মেঘের ভেলায় ভেসে সবুজ মন রঙ্গীন ঘুড়ি উড়ায় ¯^প্নের আকাশে। ¯^প্নের আকাশে নানান রঙের খেলা। হৃদয় অরণ্য এই রঙ নিয়ে খেলতে ভালবাসে। রঙে, রূপে, বর্নিল হয়ে উঠে হৃদয় অরণ্য। হৃদয়ের বর্নিল অরণ্যের মাঝি অনেক বেশী ¯^াধীন। কখনো সে খেয়াঘাটের মাঝি হতে চায় কখনো হতে চায় ফেরিওয়ালা। মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিচিত্র সাধ কবিতায় বলেছেন,
“আমি যখন পাঠশালাতে যাই
আমাদের এই পাড়ার গলি দিয়ে,
দশটা বেলায় রোজ দেখতে পাই,
ফেরিওয়ালা যাচ্ছে ফেরি নিয়ে।
ইচ্ছে করে সেলেট ফেলে দিয়ে
অমনি করে বেড়াই নিয়ে ফেরি।”
আজ মনে হয় সত্যি যদি রঙের ফেরিওয়ালা হতে পারতাম-“রঙ নেবে রঙ? নানান রঙের রঙ? লাল রঙ, নীল রঙ, সবুজ রঙ, হলুদ রঙ নানান রকম রঙ? “আমার আমি কে সৃষ্টি করার রঙ?” তখন আমার বিবাগী আর অস্থির মন নীল আকাশে আশ্রয় খুঁজে বেড়ায়। শান্তির জন্য সাদা পায়রা উড়িয়ে দেয়। লাল সূর্য আমাকে নির্ভীক হতে বলে। শেষ বিকেলের মোলায়েম লাল সূর্য আমাকে আগামী দিনের পথ চলার অনুপ্রেরণা যোগায়। বলে যায়,
“চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়
নয় বন্ধন ছিন্ন আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমার অধিক
আরো কিছু থেকে যায়
আমার না থাকা জুড়ে।”
সাগরের গভীর নীল আমাকে আমার মনের গহীনে নিয়ে যায়। যেখানে আমার আমিকে খুঁজে পাই গভীর ¯^চ্ছতায়। রং, তুলি নিয়ে খেলতে বসে যাই। রঙ্গীন তুলিতে তুলিতে আঁচড়ে আঁচড়ে ভরে তুলি মনের ক্যানভাস। আবারো হারিয়ে যাই তুলি আঁচড়ে। তখন গহীন অরণ্যের সবুজেরা আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে। সবুজ পাতার মর্মর ধ্বনি আমার হৃদয়ে দোলা দেয়। কচি কচি সবুজ পাতা নতুন সোনালী আলোয় জেগে উঠতে বলে। হলুদাভ সবুজ পাতা আশা জাগানিয়া গান শুনায়। দুপুরের সোনাঝরা কমলা রং আমার মনের গহীন অরণ্যে চাষাবাদ করে। রামধনুর বেগুনী আমায় প্রানশক্তি যোগায়। নদীর আসমানী ঢেউ আমাকে সেই সুদূরে নিয়ে যেতে চায়। এভাবে বারবার হারাতে হারাতেই আমার “আমিকে খুঁজে পাই।” যেমন করে শিল্পী তার রঙ আর রেখার মাঝেই পৃথিবীর সকল রূপকে ধরে রাখেন। মনের বিশাল সাদা ক্যানভাসে রেখাহীন রং যেন অর্থহীন কবিতা। সারাটা দিনের লাল, নীল, আসমানী, বেগুনী, সবুজ, হলদ, কমলা আলোয় রেখাবন্দী আবেগ, অনুভূতি, ¯েœহ-প্রেম, ভালোবাসায়, দুঃখ, কষ্ট, সুখ, অনুশোচনা, পরিতাপ যেন এক একটি ছন্দাবদ্ধ কবিতা। তারপরও বারবার মনের গহীন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া সুর বেজে উঠে-
“কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা
মনে মনে মেলে দিলেম
গানের সুরের এই ডানা।”
সুরে সুরে , রঙে রঙে হারিয়ে যেতে জীবনের রেখাগুলো ধরা দেয় ভিন্ন আঙ্গিকে। একেকটি রেখা যেন একটি জীবন উপাখ্যান। প্রতিটি তুলির আঁচড় এই রেখায় বন্দী হয়। আবার বিদ্রোহ করে নতুন উপাখ্যানের পথ সুগম করে। এভাবেই রেখায় রেখায় রঙে রঙে ভরে যায় মনের সাদা ক্যানভাস। দিনের শেষে গোধূলী ¯িœগ্ধ গোলাপী আলোয় ¯িœগ্ধ হয় জীবনের যত জটিলতা, ক্লেদ আর শীর্নতা। রাতের আঁধার ভেদ করে মন পাখি নতুন করে ডানা মেলে হৃদয়ের গহীন অরণ্যে।


















