চলচ্চিত্র – জীবন থেকে নেয়া
‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রের প্রারম্ভ
‘জীবন থেকে নেয়া’ একটি পরাধীন দেশ কিভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়- সেই গল্প। জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রটির কাহিনী, প্রযোজনা এবং পরিচালনা করেন বিখ্যাত নির্মাতা জহির রায়হান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছবিটি নির্মিত হয়েছে পরাধীন সময়ে। সংগ্রামের চরম পরস্থিতির সময় জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রটি মুক্তি “পায়। এই ছবিটি মুক্তি দিতে প্রচুর ঝামেলা হয়েছিল। বাংলাদেশ এর স্বাধীনতার পিছনে বড় ধরণের ভুমিকা রয়েছে এই ছবির।
জহির রায়হান একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও রাজনীতিক। তিনি ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তবে বাবার কাজের সূত্রে অনেক বছর কলকাতায় ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পরিবারের সঙ্গে কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তান চলে আসেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৭ সালে এ জে কারদারের ‘জাগো হুয়া সাবেরা’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে। পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে কাজের আমন্ত্রণ জানান। চলচ্চিত্রটির নামসঙ্গীত রচনা করেন জহির রায়হান। ১৯৬০ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। জহির রায়হান ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় ‘জীবন থেকে নেয়া’র বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয়।
জীবন থেকে নেয়া চলচিত্রের মাধ্যমে পরিচালক জহির রায়হান একটি পরিবার এর এক সার্বভৌম মহিলাকে চিহ্নিত করেছেন তৎকালীন পাকিস্তানের রাস্ট্রপতি আইয়ুব খান এর রাজনৈতিক একনায়কতন্তের রূপক অর্থে। দুইটা সমান্তরাল কাহিনি একসাথে দেখানো হয়েছে জীবন থেকে নেয়া ছবিতে। ঘরের বাইরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর ঘরের ভিতরে পরিবারের সদস্যদের উপর গৃহকর্ত্রীর অত্যাচার। ছবিতে ১৯৬৯ এর গণভ্যুত্থানের কিছু তথ্যচিত্র দেখানো হয়েছে। গল্পটি অতি সাধারণ এক পরিবারের। দোর্দণ্ড প্রতাপ ননদ, নিরীহ প্রকৃতির ভাইয়ের বউদের নিয়ে সংসারের কূটচালের কাহিনি। কিন্তু এরই আড়ালে বলা হয়ে যায় একটি জাতিকে দমন করে রাখার ইতিহাস এবং নিপীড়িত জনতার জেগে ওঠার কথা। অসাধারণ চিত্রনাট্য, সংলাপ, মন্তাজ, সংগীত, অভিনয় আর পরিচালনায় ছবিটি হয়ে ওঠে ক্ল্যাসিক।
১৯৬৫ সালে জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ শিরোনামের চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেন। তার কাহিনী অবলম্বনে চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য তৈরি করেন। কিন্তু নির্মাণের অনুমতি দেয়নি পাকিস্তান সরকার। এমনকি এফডিসিতে জমা দেওয়া চিত্রনাট্যও ফেরত দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ মনে করেন, এখনো এফডিসির পুরনো কাগজ ঘাঁটাঘাটি করলে পাওয়া যেতে পারে সেই চিত্রনাট্য। তবে তার স্ত্রী সুচন্দা ছবিটি নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও সেখানে চিত্রনাট্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সেবার না পারলেও ১৯৭০ সালে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন জহির। এ চলচ্চিত্রটি নানা কারণে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধে এই চলচ্চিত্রটি ছিল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের বড় প্রেরণা। এ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত গানটি পরে একুশের গান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই গানটিকে মানুষের কাছে জনপ্রিয় করার পেছনে ‘জীবন থেকে নেয়া’ গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ওই চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকার রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করে। তার মাত্র কয়েক বছর পর জহির গানটি ওই চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘আমার সোনার বাংলা’কে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এ ছাড়া ওই চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ ও খান আতাউর রহমানের বিখ্যাত গান ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’। সবকটি গানই স্বাধীনতা, সাম্য ও অধিকার আদায়ের প্রেরণা সমৃদ্ধ। সর্বোপরি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে মিশে আছে জহির রায়হানের নাম ও তার নির্মিত চলচ্চিত্র। (তথ্য – সামহোয়্যার ইন ব্লগ)
“জীবন থেকে নেয়া” চলচ্চিত্রের উদ্ধৃতিঃ
একটি দেশ
একটি সংসার
একটি চাবির গোছা
একটি আন্দোলন
একটি চলচ্চিত্র…
ছবির নামঃ জীবন থেকে নেয়া – Taken From Life
পরিচালকঃ জহির রায়হান
মুক্তির সনঃ ১৯৭০ ১০ এপ্রিল (পাকিস্তান)
ডিউরেশনঃ ১ ঘন্টা ৫০মিঃ (প্রায়)
সঙ্গীত পরিচালকঃ খান আতাউর রহমান
চিত্র গ্রহণঃ আফজাল চৌধুরী
সম্পাদনাঃ মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
পরিবেশকঃ আনিস ফিল্ম
দেশঃ বাংলাদেশ
ভাষাঃ বাংলা
রঙঃ সাদা কালো
গানের তালিকাঃ
• এ খাঁচা ভাঙ্গব আমি কেমন করে (খান আতাউর রহমান)
• আমার সোনার বাংলা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
• আমার ভাই এর রক্তে রাঙানো
• কারার এ লৌহ কপাট (কাজী নজরুল ইসলাম)
• জাগিয়ে দাও
• ও আমার স্বপ্নঝরা আকুল করা জন্মভূমি
অভিনয়ঃ
• রাজ্জাক
• সুচন্দা
• আনোয়ার হোসেন
• শওকত আকবর
• রোজি সামাদ
• খান আতাউর রহমান
• রওশন জামিল
• বেবি জামান
• আমজাদ
‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্র’র সারসংক্ষেপ
ভাষা আন্দোলন ও উনসত্তরের গণআন্দোলনের পটভূমিকায় বিকশিত ছবির কাহিনি। কাহিনির মূল কেন্দ্রে রয়েছে একটি পরিবার। এ পরিবারে আছেন দুই ভাই আনিস( শওকত আকবর) ও ফারুক(রাজ্জাক)। তাদের বড়বোন রওশন জামিল। বোনের স্বামী খান আতাউর রহমান।
বাবার বাড়িতে থাকা বিবাহিত বড়বোন রওশন জামিলের কারণে বাড়ির সবাই অস্থির। সংসারের সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তিনি স্বামী ও নিজের দুইভাইয়ের উপর দমন-পীড়ণ চালান। তার আঁচলে দোলে চাবির গোছা। তার পিছনে পিছনে গৃহপরিচারিকা বয়ে নিয়ে চলে পানের বাটা। রূপক এই দৃশ্যের মাধ্যমে স্বৈরশাসকের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কথা বলা হয়।
নিপীড়িত স্বামী খান আতাউর রহমান আদালতের সামান্য কর্মচারী। তিনি তার বন্ধু বেবী জামানের পরামর্শে বড় শালা শওকত আকবরের বিয়ে ঠিক করেন সাথী (রোজী সামাদ) নামে এক শান্ত তরুণীর সঙ্গে। ভাইয়ের বিয়ে দিতে বোন নারাজ, পাছে সংসারের চাবি হাতছাড়া হয় সেই ভয়ে। এই রূপকের মাধ্যমে নির্বাচন দিতে নারাজ স্বৈরশাসকের কথা বলা হয়। বোনকে না জানিয়েই শওকত আকবরের বিয়ে দেন খান আতা।
সাথী বউ হয়ে এ পরিবারে আসে। তার ওপরও শুরু হয় নির্যাতন। এদিকে সাথীর ছোট বোন বীথি( সুচন্দা)র সঙ্গে প্রেম হয় রাজ্জাকের। দুলাভাই ও বড় ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে বীথিকে বিয়ে করেন রাজ্জাক। এই দুবোনের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী। তিনি দেশের মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে কারাবরণ করেন। বাড়ির পুরনো বিশ্বস্ত গৃহকর্মী আমজাদ হোসেন মৃত্যুবরণ করেন আন্দোলনে।
সুচন্দার নেতৃত্বে বাড়ির সবাই রওশন জামিলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। বাড়ির দেয়ালে পোস্টার পড়ে। রওশন জামিলের কাছ থেকে চাবির গোছা চলে আসে দুই বোনের হাতে। পানের বাটা ঘোরে তাদের পিছনে। ক্ষমতা হারিয়ে ষড়যন্ত্র করতে থাকে বড়বোন। সাথী ও বীথি সন্তানসম্ভবা হয়। দুই বোন হাসপাতালে ভর্তি হয়। কিন্তু সাথী মৃত সন্তান প্রসব করে। এ শোক সাথী সহ্য করতে পারবে না ডাক্তারের এই আশংকায় বীথির সন্তানকে তুলে দেওয়া হয় তার কোলে। তাকে নিজের সন্তান ভেবে লালন পালন করতে থাকে সাথী। এই সময় ষড়যন্ত্র করে রওশন জামিল দুবোনের মধ্যে মনোমালিন্যের সূত্রপাত ঘটায় এবং কৌশলে বীথিকে বিষ খাইয়ে সেই দোষ চাপায় সাথীর ঘাড়ে। বীথি বেঁচে ওঠে কিন্তু বিষ প্রয়োগের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকায় ছিলেন সে সময়ের নামজাদা খলনায়ক রাজু আহমেদ। আদালতে মামলা চলে। সরকারী উকিল হন শওকত আকবর। তিনি স্ত্রীকে দোষী মনে করে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। আর সাথীর পক্ষে উকিল হন খান আতা। তিনি আদালতে প্রমাণ করে দেন মূল অপরাধী তার স্ত্রী রওশন জামিল।
‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রর বর্ণনাময় বিবরণ
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যে কজন তরুন প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে কারাবরন করেছিলেন- জহির রায়হান তাদের একজন। সেই আন্দোলনকে নিয়ে লিখেছিলেন ‘পোস্টার’ নামে একটি গল্প ও ‘আরেক ফাগুন’ নামের উপন্যাস। ইচ্ছে ছিল ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে ছবি নির্মাণের। সে ছবির জন্য একটি পোস্টারও ডিজাইন করেছিলেন। কিন্তু সরকারের বাধার কারণে তা হতে পারেনি। ১৯৬৯-৭০ সালের দিকে বিহারী প্রযোজক আনিস দোসানি জহির রয়হানকে একটি ছবি বানাতে বললেন। জহির কাহিনি ও চিত্রনাট্যের জন্য ডাকলেন আমজাদ হোসেনকে। জহির জানালেন, ‘এমন একটা গল্প হবে যেখানে এক বোন আরেক বোনকে বিষ খাওয়াবে।’ আমজাদ বললেন, ‘বোন বোনকে বিষ খাওয়াবে! দর্শক কি ব্যপারটা গ্রহণ করবে?’ আমজাদ লিখে ফেললেন প্রথম দৃশ্য। কিন্তু অন্যরকম, এক বোন আরেক বোনকে দুধ-ভাই খাওয়াচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জহির স্ক্রিপ্ট দেখলেন। দেখেই বললেন, ‘খাওয়াতে বললাম বিষ! আর খাওয়াচ্ছেন দুধ!’ আমজাদ হেসে বলেন, ‘দুধ না খাওয়ালে বিষ খাওয়াবো কিভাবে!’ এরপর আমজাদ যেভাবেই লেখেন না কেন, তা পারিবারিক গল্প থেকে রাজনৈতিক গল্পে চলে যাচ্ছিল। এখানেও আছে আরেকটা গল্প আছে। এর আগে গণঅভ্যুত্থানে আসাদ শহীদ হবার কিছুদিন পর মওলানা ভাসানী তার দলীয় কর্মী আমজাদ হোসেনকে ডেকে আসাদকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি নির্মাণের জন্য বলেন। কিন্তু সরকারি চাপে আসাদের পরিবারের অনুরোধে সে কাজটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তিনি জীবন থেকে নেয়ার স্ক্রিপ্ট লিখতে বসে বারবার রাজনীতির গল্পে ঢুকে যাচ্ছিলেন। এক সময় জহির দেখলেন নিজের ইচ্ছেও গল্পটায় ঢুকে পড়ছে। এরপর দুজন মিলে স্ক্রিপ্ট শেষ করলেন। প্রথমে চলচ্চিত্রটির নাম ঠিক করা হয় ‘তিনজন মেয়ে ও এক পেয়ালা বিষ’। কিন্তু লেখার মাঝামাঝি অবস্থায় একদিন জহির রায়হান নাম পাল্টে রাখলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’।
এই ছবি শুটিংকালেই সরকারি নজরদারিতে পড়ে। শুটিংয়ের চলাকালে একদিন এফডিসির ২নং ফোরে আর্মি এসে শুটিং বন্ধ করে দেয়। সকাল দশটায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধরে নিয়ে গেলেন জহির রায়হান এবং রাজ্জাককে। বিকেল চারটায় ফিরে এলেন তারা। আসার আগে জহির রায়হান বন্ড দিয়ে এলেন, যদি এই চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাবার পর দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে তবে তার সব দায়ভার তিনি বহন করবেন। শুটিং হলো সাভার, এফডিসি এবং জহির রায়হানের বাড়ির ছাদে।
চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেল ১০ এপ্রিল ১৯৭০। ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলী ও মেজর মালেক এবং তাদের দোসররা সেন্সর ছাড়পত্র না দেয়ার চক্রান্তে লিপ্ত হয়। কারণ তারা বুঝতে পারেন রওশন জামিলের চরিত্রটি একটি স্বৈরাচারের চরিত্র। দেশপ্রেমিক সচেতন দর্শক আগেই তাদের খায়েশ জানতে পেরে মিছিল শুরু করে দেয়। সামরিক সরকার বাধ্য হয় ছবিটি মুক্তি দিতে। কিন্তু মুক্তির প্রথম দিনই সারাদেশে হৈচৈ পড়ে গেল। প্রথম দিনই নিষিদ্ধ হলো প্রদর্শনী। সব সিনেমা হল থেকে আর্মি জব্দ করে নিয়ে গেল সিনেমার রিল। ঢাকার গুলিস্তান হলের সামনে শুরু হলো বিক্ষোভ। পরদিন সেন্সর বোর্ড আবার বসবে সিনেমাটি দেখতে। সাথে থাকবে রাও ফরমান নিজে। জহির অনেক ভেবে একজনের কথাই স্মরণে আনতে পারলেন, যিনি পারেন ছবিটিকে আবার আলোর মুখ দেখাতে। জহির রায়হান আমজাদ হোসেনকে দায়িত্বটা দিলেন। কারণ তার এলাকার মানুষ তিনি। আমজাদ হোসেন গেলেন সেন্সর বোর্ডের সদস্য নাট্যকার আসকার ইবনে শাইখের কাছে। আমজাদ তার হাটুর কাছে বসে পা টিপতে টিপতে বললেন, ‘স্যার আপনার উপরে সবকিছু। আপনি প্লিজ কালকে যাবেন।’ উনি বললেন, ‘আমি অসুস্থ। হাই প্রেসার তাই যেতে পারবো না।’ আমজাদ কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললেন, ‘স্যার সারাদেশ আপনার দিকে তাকিয়ে।’ পরদিন শাইখ সাহেব গেলেন সেন্সর বোর্ডে। বোর্ডে উপস্থিত অল পাকিস্তান সেন্সর মেম্বার। আমজাদ প্রজেকশন রুমে চুরি করে অবস্থান নিয়ে প্রজেকশনের ছোট ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে রইলেন। রাও ফরমানসহ বাকি সদস্যরা ছবিটি দেখলেন। ছবি শেষে চেয়ারম্যান সাহেব সবার মুখের দিকে তাকিয়ে কি মনে করে আসকার ইবনে শাইখকে বললেন, ‘আপনি বলেন।’ তিনি, কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর দাঁড়িয়ে বললেন, ‘স্যার পবিত্র কোরআনে কোন মিথ্যে কথা বলা নেই। মিথ্যে কথা বলবার কোন সুযোগও সেখানে দেয়া হয়নি। জহির হয়ত ভুল করে একটা সত্য সিনেমা বানিয়ে ফেলেছে। এই সত্যকে আমি কিভাবে মিথ্যা বলি!’ কেউ আর কোন কথা বলল না। ছবিটি মুক্তি পেল। তবে প্রজেকশন শেষে রাও ফরমান জহিরকে বললেন, ‘ছবিটি ছেড়ে দিলাম। বাট আই উইল সি ইউ।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় ছবিটি কলকাতার হলে রেকর্ড ব্যবসা করে। জহির অবাক হয়ে দেখেন ছবিটি দারুন ব্যবসা করছে। কিন্তু এখান থেকে একটা টাকাও জহির নিজে খরচ করেননি। পুরোটাই তুলে দেন মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে। সহকারী অরুণ রায় পরবর্তীতে তার চীফ আফজাল চৌধুরীকে বলেছিলেন, ‘সেদিন পকেটে খাবার পয়সা ছিল না, অথচ জহির ভাই সবগুলো টাকা মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে জমা দিয়ে দেন।’ কিন্তু তারাই জহিরকে নিয়ে নানা চক্রান্ত শুরু করেছিল। যেটা শুরু হয়েছিল প্রামণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি করার সময়। (তথ্য- বাংলা মুভি ডেটাবেজ)।
বিশ্লেষণধর্মী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’
জীবন থেকে নেয়া’ চলচিত্রর মাধ্যমে শহীদ মিনারে প্রভাত ফেরী, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই শ্লোগানের অসাধারণ দৃশ্যায়ন রয়েছে। ‘আমার সোনার বাংলা’ এবং ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানের চিত্রায়নও ছিল অনবদ্য। ছবিতে রাজ্জাককেও গণআন্দোলনের কর্মীর ভূমিকায় দেখা যায়।
উনসত্তরের গণআন্দোলনের স্থির চিত্র ব্যবহার করা হয়। মিছিলের দৃশ্য দেখানো হয়। সব মিলিয়ে পরিচালকের মুন্সিয়ানায় সাধারণ একটি পরিবারের গল্প হয়ে ওঠে বাঙালির জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অসাধারণ দলিল। এ ছবিতে ব্যবহৃত রবীন্দ্রসংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ স্বাধীনতার পর আমাদের জাতীয় সংগীতের স্বীকৃতি পায়। ছবিতে প্রত্যেক কুশীলবের বিশেষ করে খান আতাউর রহমান, আনোয়ার হোসেন এবং রওশন জামিলের অভিনয় ছিল অনবদ্য। রূপকধর্মী সংলাপও এ ছবির অন্যতম সম্পদ। ক্যামেরার কাজ ছিল দারুণ। বিশেষ করে প্ল্যাকার্ড বহনের সময় গুলির শব্দ এবং প্ল্যাকার্ড পড়ে যাওয়ার মা|ধ্যমে মৃত্যুকে বোঝানো। সিনেমাটির চিত্রগ্রাহক ছিলেন আফজাল চৌধুরী। সিনেমাটির প্রযোজকও ছিলেন জহির রাহয়ান। চিত্রনাট্য লিখেছিলেন জহির রায়হান ও আমজাদ হোসেন।
এ ছবির একটি আলোচিত গান ছিল খান আতাউর রহমানের কণ্ঠে ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে’। ছবির কাহিনিতে দেখা যায় যখনই ঘরজামাই খান আতা গানটি গাইতে যান তখনি বাঁধার মুখোমুখি হন। স্ত্রীর নির্যাতনে তিনি কখনও গানটি সম্পূর্ণ গাইতে পারেন না। ফলে ছবির দর্শকরা পুরো গানটি শুনতে পারেন না।
পরবর্তীতে ছবির সংগীত পরিচালক খান আতাউর রহমান এক সাক্ষাৎকারে বলেন গানটি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই শেষ করেননি। কারণ খাঁচা ভাঙার সংগ্রামের কোনো শেষ নেই। মানুষের মুক্তি পুরোপুরি যতদিন অর্জিত না হবে ততদিন খাঁচা ভাঙার আকুতি ও সংগ্রাম চলবে। (তথ্য- bangla.bdnews24.com)
ছবির একটি অনবদ্য দৃশ্য হল একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরীতে শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার দৃশ্য। বাস্তব সেই দৃশ্য ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে নেওয়া। চিত্রগ্রাহক আফজাল চৌধুরীর প্রধান সহকারী অরুণ রায় উঁচু থেকে প্রভাতফেরীর শর্ট নিচ্ছিলেন। আর সহকারী তমাল (কবি জসিমউদ্দীনের ছেলে) নিচ্ছিলেন দূর থেকে যেসব দল এগিয়ে আসছিল শহীদ বেদীর দিকে তার ফুটেজ। এদিকে আফজাল চৌধুরী নিজে ধারণ করছিলেন শহীদ বেদীতে আসা দলগুলোর নগ্ন পায়ে আসা এবং ফুল দেয়ার দৃশ্য। প্রভাত ফেরির একটি দৃশ্যে অবশ্য জহির রায়হান নিজেই উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ জহির ছুটে গেলেন আফজালের কাছে। গিয়ে বলেন, ‘আমাকে একটু দেখিয়ে দিন তো কিভাবে ক্যামেরায় শ্যুট করতে হয়! আমি নিজে ধারণ করবো।’ তখন আফজাল তাকে শট নিয়ে সংক্ষিপ্ত ধারণা দিলেন। আর জহির মনের আনন্দে শুরু করলেন ভিডিও ধারণ। জহির রায়হান নিজেই একজন এডিটর ছিলেন, ফলে মাথায় এডিটিংয়ের ভাবনা রেখে ধারণ করলেন বেশ কিছু দৃশ্য। (তথ্য- বাংলা মুভি ডেটাবেজ)।
প্রান্তিকতায়
শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হানের অনবদ্য সৃষ্টি ‘জীবন থেকে নেয়া’। স্বাধীন বাংলাদেশ আবির্ভাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার চলচ্চিত্র। বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত জহির রায়হানের চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকারের কথা, সংগ্রামের কথা। মুক্তিযুদ্ধে তার চলচ্চিত্র ছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালীর প্রেরণার উৎস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নিয়ে ষাটের দশকেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সাহসিকতার পরিচয় দেন জহির রায়হান। এমন সাহসী মানুষটি হারিয়ে যান দেশ স্বাধীনতা হওয়ার মাত্র দেড় মাস পরে, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে মিরপুর গিয়ে তিনি আর ফিরে আসেননি।
পরিচালক জহির রায়হান সর্বোপরি একটি পরিবার এর এক সার্বভৌম মহিলাকে চিহ্নিত করেছেন তৎকালীন পাকিস্তানের রাস্ট্রপতি আইয়ুব খান এর রাজনৈতিক একনায়কতন্তের রূপক অর্থে। দুইটা সমান্তরাল কাহিনি একসাথে দেখানো হয়েছে জীবন থেকে নেয়া ছবিতে। ঘরের বাইরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর ঘরের ভিতরে পরিবারের সদস্যদের উপর গৃহকর্ত্রীর অত্যাচার। ছবিতে ১৯৬৯ এর গণভ্যুত্থানের কিছু তথ্যচিত্র দেখানো হয়েছে। ছবিতে রওশন জামিল সেই গৃহকর্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। যিনি সব কর্তৃত্ব নিজের আয়ত্তে রাখতে চান। তাঁর কাজ হলো, চাবির গোছা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবাইকে ধমক দেওয়া। তাঁর এমন শাসন কেউই মানতে চায় না। একসময় ঘরের দরজা ও দেয়ালে পোস্টার সাঁটা হয়। তাঁর শাসন থেকে মুক্তি পেতে পরিবারের অন্য সদস্যরা আন্দোলনও করে। একসময় তিনি নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন। ঠিক একইভাবে পাকিস্তান নতিস্বীকার করতে বাধ্য এবং বাংলাদেশ এর স্বাধীনতা আসে।
বাংলা চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ অসাধারণ চিত্রনাট্য, সংলাপ, মন্তাজ, সংগীত, অভিনয় আর পরিচালনায় ছবিটি হয়ে ওঠে ক্ল্যাসিক। যা আজো আমাদের কাছে কালজয়ী ইতিহাস বহনকারী দলিল হিসেবে প্রাণবন্ত সাক্ষর হয়ে আছে।


















